Thursday, January 12, 2023

আমাদের বিলে / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

 

আমাদের বিলে / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়


দত্তবাড়ির সিমলেপাড়ার দুরন্ত সেই ছেলে,

ভালো নাম নরেন্দ্রনাথ, আদরের বিলে

মহাদেবের বরে, ভুবনেশ্বরীর কোলে,

অবশেষে বিলে এল হাজার আলো জ্বেলে।

রেগে যেতে চট করে একরত্তি বিলে,

হাতের কাছে যা কিছু ছুঁড়ে দিত ফেলে।

মাথায় ঢেলে ঠান্ডা জল শিবের নাম নিলে,

সব রাগ জল হত শান্ত হত বিলে!

"ধ্যান ধ্যান" খেলা হত ছেলেপুলের সাথে,

একদিন সেথায় এল সাপ দেখতে দেখতে

ফণা তোলা সাপ দেখে সাথীরা পালাল,

ধ্যানমগ্ন বিলের সাথে সাপও থাকল ।

মা'কে লুকিয়ে জামাকাপড় আলনা থেকে ছুঁড়ে,

জানলা দিয়ে ফেলে দিত ভিখিরির কোলে।

বাবা ছিলেন বিশ্বনাথ পেশায় আইনজীবি,

দিনেরাতে আসত মানুষ, নানাজাতের ছবি।

সারে সারে থাকত হুঁকো আপিসঘরের কোণে,

জাত যায় কিনা করল পরখ দেখল হুঁকো টেনে ।

মাষ্টারমশাই পড়াতে এলে খাটে শুয়ে শুয়ে,

বলত সে "আপনি পড়ুন, শুনি আমি শুয়ে"

এমনি ছিল ছোট্ট বিলের নানান কেরামতি,

বুদ্ধিমান আর মেধায় ঠাসা মস্তিষ্কের গতি।

কলেজপাঠের সময় আলাপ পাগল প্রভুর সাথে,

পালটে গেল বিলের জীবন ব‌ইল অন্যখাতে ।

Friday, August 5, 2022

চাকরি বিক্রি / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

রোজকার মতন দরজার কোণায় মুখ চুন করে দাঁড়িয়ে থাকে লীলা। মুখে রা'টি কাড়ে না। গৃহকর্ত্রী পল্লবী চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে থেমে একসময় ক্লান্ত হয়ে যান। এই সময়টায় তাঁর অফিস যাবার তাড়া। যদিও একটু দেরীতে বেরোন তবুও এ হল অপ্সরা আবাসনের দু' নম্বর গেট দিয়ে ঢুকে, চারতলার তিননম্বর ফ্ল্যাটের রোজনামচা। পল্লবীর অফিসের দেরী হয়ে যায়। লীলা কে কাজ বুঝিয়ে তবে চান সেরে খেয়েদেয়ে তাঁর বেরুনো। পুরনো লোক লীলা। তবুও রোজ কিছু না কিছু বলার থাকেই। আজ সিল্কের শাড়িটা ইজিতে ভিজিও কিম্বা দাদার শার্টে নীল দিও।কালকের জন্য পোস্ত টা বেটে ফ্রিজে তুলে রেখো অথবা মায়ের ফলটা চাপা দেওয়া আছে। মনে করে হাতে ধরিয়ে দিও এমন সব কেজো কথা।

তার আগে পল্লবীর অশোক কে টিফিন করে দেওয়া। আগেরদিনের লাঞ্চবক্স অধিকাংশ দিন পল্লবী কিম্বা অশোক কেই ধুয়ে নিতে হয়। এই নিয়ে অশোকের সঙ্গে বচসা হয়। সেটা আগেভাগে এসে লীলার ধোয়ার কথা। পল্লবীরা রান্নার লোক রাখেনা। লীলা পরের দিনের টা সব কেটে কুটে  ধুয়ে, মশলা বেটে রেখে দিয়ে যায়। পল্লবী সকালে রেঁধে বেড়ে গুছিয়ে রেখে অফিস যায়। 


- কতবার বলেছি, আরেকটা লাঞ্চবক্স অনলাইন কিনে ফেল। 

- রাখব কোথায় এত জিনিষ? ফ্ল্যাটবাড়িতে সীমিত জায়গায় আর অনলাইন জঞ্জাল বাড়িও না। 

- অফিস যাওয়ার আগে রোজরোজ এই লীলার আসার দেরী নিয়ে আমারো খিটিমিটি শুনতে ভালো লাগেনা। কোথায় আরাম করে ব্রেকফাস্ট খাব কাগজ পড়তে পড়তে তা নয়, রোজ একেবারে চিল চীত্কার করতে থাকো।  

পল্লবী বলে ওঠে, আমার বেরুনোর আগে ওকে সব বুঝিয়ে না গেলে পারবেন মা? ওকে ডিল করতে? 

- বোর্ডে লিখে রেখে যাও তবে। অশোক বলে। 

 - অত পারব না সকালবেলায়। লীলার‌ই বা এত জেদ কিসের্? আমরা কি মাইনে কম দি? কেন‌ই বা সে আসবে না টাইম মত? 

- জানোই তো, কবরডাঙার রাস্তার কি অবস্থা। আমি তো রোজ যাই ঐ পথে।  

- তাহলে? আমি কি করব বলতে পারো অশোক? 

-তবে এমনি চলবে নিত্যি ঝগড়া? লীলাও কাজ ছাড়বে না, টাইম মত আসবেও না আর তুমিও চেঁচিয়ে যাবে এভাবে? অন্য লোক দেখে লীলাকে তবে স্যাক কর ইমিডিয়েটলি। 

- বিশ্বস্ত লোক পাওয়া মুশকিল বুঝলে?  আমরা থাকিনা সারাদিন। মা কিছুই পারেন না। নিজের ঘরে ঢুকে শামুকের মত গুটিয়ে রাখেন নিজেকে। কতবার বলেছি, একটু বাইরের ঘরে বসে লীলাকে চালনা করলেও তো হয়। উনি পারবেন না। বিশ্বযুদ্ধ থেকে দেশীয় রাজনীতির খবরে ডুবে থাকেন যে কি এত বুঝিনা বাপু। সারাটা জীবন এভাবেই কারোর কাছ থেকে কোনো হেল্প পেলাম না। চাকরিটা যে কিভাবে টিকিয়ে রেখেছি আমি‌ই জানি শুধু।

অশোক আর কথা বাড়ায় না। পল্লবী নিজের কোর্টে বলটা নিয়ে চানঘরের দিকে পা বাড়ায়।   

লীলা কাজ শুরু করবে কি, রোজ এই সময়ে তার ফোন আসে। 

ঘরে পা দিতে না দিতেই তার ব্যাগের মধ্যে রাখা মোবাইল টা বেজে ওঠে। চার্চের প্রার্থনা সঙ্গীত। অর্গ্যান, পাইপ, বেল সমন্বিত গুরু গম্ভীর রিং টোন। সচারচর শোনা যায়না এমন গান। পল্লবীর মাথাটা রোজ গরম হয়ে যায় এটা শুনলে। এত দেরী করে এসে আবার ফোন বাজে কেন গো তোমার? লীলা কোনো উত্তর দেয়না। 

আরেকদিন পল্লবী বলেছিল এই সুরটা অসহ্য। হাটাও তো ছেলে কে বলে। 

তখন লীলা বলেছিল। এই দেখোনা, গ্রামের ঘর ঘর লোকের মোবাইলের রিং টোন ওরা সেদিন এসে সব বদলে দিয়ে গেছে। কার ছিল মা মনসার গান, কার ছিল হরেকেষ্ট কেত্তন একধার থেকে সেই সাহেবগুলো এসে বদল করে চার্চের ঘন্টা আর ওদের সব গান করে দিয়ে গেল।   

ততক্ষণে লীলা মুখে কুলুপ এঁটে কাজে মন দেয়। লীলার সংসারে তার দোজবরে স্বামী। প্রতিরাতে মদ চাই‌ই তার। তারপর হাতের পাঁচ সাট্টা কিম্বা জুয়ার নেশা। সেই কবে জানি লীলার শ্বশুরদের ক্রীশ্চান করে গেছিল অষ্ট্রেলিয়ার সাহেবরা এসে। তা বেশ বহু বছর আগের কথা। ওদের অভাবের গ্রামে সবাই ছিল খুব গরীব। সাহেবগুলো এসে পাখীপড়া করে বুঝিয়ে বুঝিয়ে একদিন গ্রামশুদ্ধ বেশ কয়েকঘর পরিবার কে যীশুর বাণী শুনিয়ে ধর্মান্তরিত করেই একপ্রকার ছেড়েছিল। হাতে বাইবেল ধরিয়ে দিয়ে ওরা বলেছিল কাজ দেবে।  ছেলেপুলেদের ইংরেজী মিডিয়াম ইশকুলে ফ্রি তে পড়ার সুযোগ করে দেবে। 

পল্লবীর শাশুড়ি সেই শুনে বলেছিলেন, কাজ দিয়েছিল তোদের? 

কি জানি? আমার শ্বশুর ওদের গির্জায় মালীর কাজ করত শুনেছি। গ্রামের বাচ্ছাগুলোকে ইংরেজী ইশকুলে ভর্তি টা এখনও করে দেয় অবিশ্যি, সেটা চোখের সামনে দেখা। রুটি বেলতে বেলতে বলেছিল লীলা। আমার নাতিটাও পড়ে ইংরেজী ইশকুলে। 

সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোত আমাদের গ্রামের সবার। একদিন কুড়িহাজার টাকার ফাঁদে ফেলে নিজেদের ধম্মো গছিয়ে দিয়ে তবে সহেবগুলোর শান্তি হল। 

তারপর? চাকরী? 

লীলা বলেছিল, চাকরীবাকরী কি গাছে ফলে মা? গ্রামের সবাই রবিবার করে চার্চে যাওয়া শিখল, গোরু শুয়োর খাওয়া থেকে বড়দিনে কেক, নিউইয়ার সব শিখে গেল। আমার শাশুড়ি তবুও ঘরের মধ্যে কুলুঙ্গীতে রাখা রাধাকৃষ্ণর ছবিতে ফুল জল দিত, দেখেছি। গ্রামের দুর্গাপুজোতেও চুপিচুপি দু-চারটাকা দিয়ে ভোগ নিয়ে ঘরে এসে খাই। এত দিনের সংস্কার, কি করে ভুলি বলত মা? আমরা সরস্বতীপুজোতেও অঞ্জলি দিয়ে আসি। কালীপুজোতেও নাতি কে বাজি কিনে দি। গ্রামের মুসলমানরাও তাই করত। তবে ওদের আড়ালে ঘরে বসে আজান দিলেও ভুলেও ওরা শুয়োরের মাংস ছুঁতো না।  

আচ্ছা মা, বল দিকিনি? আমরা পয়সার জন্য ধম্মো বিক্কিরি করেছি বলে কোনো স্বাধীনতা থাকবে না আমাদের ? আমার বর বলে, না, থাকবে না। কেনা গোলাম হয়ে থাকতে হবে। ওরা আমাদের টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছে না? তাই। 

সেই কবে আমার শ্বশুর কে মাত্র কুড়ি হাজার টাকা দিয়েছিল, সেই টাকায় এতগুলো বালবাচ্ছা, এতগুলো পেট। আমরা মুখ্যু তো কি বুঝিনা যেন। 


সেদিন পল্লবীর অফিসের ছুটি। একটু নিরিবিলিতে কথা না বললে আর যেন চলছে না তার। পল্লবীকে ডাক দেয় লীলা। বৌদি আরো ক'টা হ্যাঙার এনো। দাদার শার্টগুলোয়... বলেই চেঁচিয়ে ওঠে, উজালা ফুরিয়েছে। অনেকদিন বলেছি। আর শোনো ঐ কি যেন শাড়িতে মাড় দেওয়ার ঐ পাওডারটাও এনো মনে করে। 

হঠাত মায়া হয় তার লীলার জন্য।  

ছাদে গিয়ে লীলার কাচা কাপড়গুলো টেনেটুনে ঠিক করতে করতে পল্লবী বলে ওঠে, কেন আসছ না গো একটু সকাল সকাল? রোজরোজ বলি তবুও...আমারো ভাল্লাগে না এসব নিয়ে একঘেয়ে কচকচানি।  যখন তোমার টাকার দরকার হয় আমি দি‌ই কিনা? সুবিধে অসুবিধেয় ছুটি? তাও দি‌ই, তবুও...লীলা কাপড়গুলো দড়িতে মেলে, ক্লিপ দেয় পরম যত্নে। তারপরেই ছাদের ওপর বসে পড়ে রোদের মধ্যে। শীতকালে আর রোদে বসার ফুরসত ক‌ই তার? পল্লবীও ভাবে আহা, বসুক একটু। তবে লীলা আজ রোদে বসেছে সব খোলসা করে বৌদিকে বলবে বলে।  

 তার‌ও রোজরোজ ভালো লাগছে না কাজে আসামাত্তর এত ঝগড়াঝাটি। 

- হ্যাগো, তোমার বরের কাজটা হল শেষমেশ? পল্লবী বলে ওঠে। আর ছেলের সেই কাজটা করছে এখনো?

- বর সেই কাজটা বিক্কিরি করে দিয়েছে গো বৌদি। আমাদের পাড়ার আরেকটা লোক বহুদিন কাজ কাজ করছিল।  

- কাজ বিক্কিরি?

- আমার বর বলে তুমি খাটছ, ছেলে কাজ করছে, আমি আর কি করব কাজ করে? তাই যার কাজের দরকার তাকে...

- মানে? অবাক হয় পল্লবী।

- এই দালালির ব্যবসাই তো করে আমার বর টা। খিষ্টান সাহেবদের দেওয়া শ্বশুরের মালির চাকরিটা শ্বশুর মারা যাবার পর ও কিছুদিন কাজ করেই তো বিক্কিরি করে দিল আরেকজন কে।  তারপর কিছুদিন বাড়িতে মাছ, মাংস, কাপড়চোপড়, বড়দিনে ঘর রং সব হল তাই দিয়ে। মদের আড্ডায় হাঁস, মুরগি পোড়ানো হল। দিনকয়েক ফূর্তির পরেই পকেটে টান পড়তেই আবার কাজ জুটিয়ে নিল সে। ক'দিন করতে না করতেই সেই চাকরিটাও বিক্কিরি করে দিল আরেকজন কে। সেটা ভালো কাজ ছিল গো বৌদি। অনেকবার বলেছিলুম আমরা। ছেড়ো না। কাজের মধ্যে থাকো। শরীর ভালো থাকবে।  কাজ না থাকলেই তো বদমায়েসি সব বুদ্ধিশুদ্ধি মাথায় ভর করে তার। সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি ছিল । আবার বেচে দিল সে।

পল্লবী বলল, এই যে বারেবারে চাকরিগুলো বিক্রি করে দেয় তাতে তার লাভ কি লীলা? 

মাস মাইনে তো কম গো বৌদি। বিক্রি করলে মাস মাইনের ছ' গুণ এককালীন পাবে। কাজ না করে বসে বসে টাকা পেতে কার না ভলো লাগে বল? কুঁড়ের মরণ আমার বর টা। মাথায় যত দুষ্টু বুদ্ধি। তাও টাকাগুলো ব্যাংকে বা পোস্টাপিসে ফিক্স করে রাখলেও হত। তাও রাখবে না।  আর কতদিন আমি কাজ করতে পারব বল তো বৌদি?  

কথায় কথায় খেঁই হারিয়ে যায় পল্লবীর। লীলার বরের চাকরি রহস্য শুনে আপাদমস্তক জ্বলে যায় তার। আবার মায়াও হয় লীলার জন্যে। মনে মনে ভাবে নিজের ধর্ম কে বিক্রি করেছে যার বাবা সে তো এমন হতেই পারে। গোড়াতেই গলদ যে। পল্লবীর সঙ্গে সেদিনের মত কথাবার্তায় ছেদ পড়ে যায়।  

আবারো ঘরে ঢুকে পল্লবীর মনে পড়ে, আচ্ছা লীলার বর চাকরি বিক্রি করছে বারেবারে তার সঙ্গে লীলার রোজ রোজ কাজে দেরী করে আসার কি সম্পর্ক হতে পারে? নিকুচি করেছে। যত্তসব। মাথায় ঢোকেনা তার। নিজের ঘরে ল্যাপটপ খুলে বসেছে পল্লবী। অফিসের কিছু কাজ বাকী আছে। আজ সারতেই হবে তাকে। তার আগে চাকরি বিক্রির এই অভিনব গল্প টা সংক্ষেপে হোয়াটস্যাপ করে দেয় অশোক কে। হাসিও পায়, কান্নাও আসে। 

অশোক টাইপ করে, 

- ওমা এই কদিন আগেই কাগজে পড়লে না? একটা লোক দু'জায়গায় সারাজীবন চাকরী বজায় রেখে মাইনে নিত। কতদিন বাদে ধরা পড়ে কেস খেল।   

পল্লবী বলে,  কি বুদ্ধি এদের! এরা পড়াশুনো করলে দেখিয়ে দিত। 

এবার হোয়াটস্যাপ বন্ধ। পল্লবীকে অফিসের কাজ সারতেই হবে।  

লীলার ঘরমোছার বালতিতে সিট্রোনেলার গন্ধে পল্লবীর হুঁশ হয়। টেবিলের নীচটা মুছবে লীলা। রোজ সে বাড়ি থাকেনা। দেখতেও পায়না। কি যে মোছে লীলাই জানে। সরে এসে দাঁড়ায় পল্লবী। আবারো সেই পুরনো কিসস্যা। 

- কাল থেকে তবে একটু তাড়াতাড়ি এসো কিন্তু, বুঝেছ? 

ঘর মুছতে মুছতে এবার লীলা বলে, 

- তুমি বরং অন্য লোক দেখে নাও বৌদি। আমার এমনি হবে।

পল্লবী ভাবে, এতদিনের লোক লীলা, আজ এমন বলছে কেন? লীলা কে ছাড়া ভাবতেই পারেনা সে কিছু। ঘরের সব কাজগুলো গুছিয়ে করে রেখে যায় তো। এইজন্যেই বুঝি মা বলেন, স্যাকরার ঠুকঠাক ভালো, কামারের এক ঘায়ের চেয়ে। সে কি তবে আজ একটু বেশীই কথা বলে ফেলল লীলার সঙ্গে?  

অমনি সে বলে, 

- এখন পৌষমাস। এখন লোক ছাড়াই না আমরা। ওহ্! তুমি আবার এসব জানবে কি করে? হিন্দুধর্মের আগা-পাশ-তলা সর্বস্ব তো বেচে দিয়েছ জন্মের মত? 

লীলা বলে 

- আমায় বোল না এসব বউদি। তুমি খুব ভালো করেই জানো আমি হিন্দুর মেয়ে, এসব এখনও মানি। বিজয়ায় তোমাদের পায়ে হাত দিয়ে পেন্নাম করি।  

পল্লবী বলে 

- ঠিক আছে, ঠিক আছে। কাজ শেষ কর তো। আমি কাজ নিয়ে বসব এবার। 

ঘর মুছতে মুছতে লীলা বলে, 

- মাঘমাসেই দেখে নাও তবে লোক। যে তোমার টাইমে আসবে।

পল্লবী আর কথা বাড়ায় না। বাকী কথাগুলো লীলাই বলে চলে নিজের মনে, একনাগাড়ে। তোমাদের তো লোক নাহলে চলবে না। আমার এই কাজ টা না হলেও চলে যাবে। ইশকুলের চাকরি টা আমার পাকা। 

পল্লবী শুনে চলে সেসব। 

- ইশকুল? 

- হ্যাঁ, আমি আমাদের গ্রামের ইশকুলে মিড ডে মিলে বহুদিন রান্না করি। সেখানে চাকরী টা বজায় রাখতে সকালবেলায় হাজিরা দিয়ে, খাতায় নাম স‌ই করে, রান্নার জোগাড়টা দিয়ে তবেই তোমার এখানে কাজে আসি। 

- তবে ইশকুলের রান্না কে করে? পল্লবী বলে 

- আমার হয়ে আরেকজন গিয়ে বেলায় করে। তাকে আমি আদ্দেক মাইনে দিয়ে দিই। সেইজন্যেই তো তোমাদের বাড়ি আসতে আমার দেরী হয়ে যায় বুঝেছ? দুটো চাকরি না করলে এই আগুণ বাজারে সংসারটা কি করে চালাব বলতে পারো?

অফিসের কাজ মাথায় উঠল পল্লবীর । তার আকাশবাতাসে তখন একটাই কথা, চাকরি বিক্কিরি, ধর্ম বিক্কিরি, মিড ডে মিলের চাকরি এইসব আর কি!  

হঠাত অশোকের নাম ফুটে ওঠে তার মোবাইলে।  রিং টোনে সেই পছন্দের গান। অঞ্জন দত্ত মিহি সুরে বলে চলেন, চাকরী টা আমি পেয়ে গেছি, বেলা শুনছ? 

ফোনটা কেটে দেয় পল্লবী। আবার চাকরী? 

( যুগশংখ রবিবারের বৈঠক এ প্রকাশিত) 

Wednesday, May 18, 2022

ধর্ষণের পর / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

ধর্ষণের পর 

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় 

৯৮৩১০৩৮০৬৬ 


কানাঘুষো 

সেই মেয়েটির কী হয়েছে? মারা গেল যে কোভিডে

কোভিড তো নয়, মরেছে সে মারাত্মক এক গ্যাং-রেপে।

বলছে সবাই গাঁয়ের লোকে, কোভিডই তো হয়েছিল। 

ঢাকাচাপা আর কদ্দিন? আকাশও সেদিন কাঁদছিল। 

আর ঐ মেয়েটা? বাসে চেপে সেদিন যে ঘর ফিরছিল? 

ভরদুপুরে সে মেয়ের ওপরও কুকুরগুলো চড়াও হল। 

কুকুর? থুড়ি কুকুর তো নয় নোংরা ক'টা লোক ছিল 

লোকগুলোরও দাদাগিরির মজা লোটার সাধ হল। 

সস্তা মেয়ে, ধ্বস্ত মেয়ে, কব্জা করে ভারি আরাম  

হাড়েগোড়ে লুঠতে শরীর, ঠুনকো শরীর নেই যে দাম। 



ধর্ষিতা 

স্তব্ধ, শূন্য দ্বীপের মধ্যে রিক্ত আমি ধর্ষিতা 

ক্লান্ত, শ্রান্ত একা মেয়ের সঙ্গী তখন নির্জনতা। 

লজ্জা? ছিল আমার ভূষণ। গর্ব? ছিল মেয়ে বলে 

তবুও তো আমি সব খুইয়ে, ভাবছি সব আজ গেছে চলে। 

রক্তমাংস এত ভালোবাস? ভালোবাস তাই দাদাগিরি

নারী শরীরের রক্তমাংস নিয়ে তাই কর কাড়াকাড়ি। 

ক্ষমতা দেখাও ধর্ষক?   

ইজ্জত নিয়ে টানাটানি কর, মেয়ে শরীরের দর্শক। 

পুরুষ নাকি বীর্যবান?

বোধহয় তোমার অন্যজাত, শুধুই শক্তিমান। 

কা-পুরুষ অথবা না-পুরুষ নাকি লিঙ্গ চতুর্থ সেক্স?

ধর্ষকলিঙ্গ বোধহয় আলাদা, পাইরেটেড, ট্রিপল এক্স।  

শিখেছিলাম তো একলা চলো, একলা চলো রে 

একলা পথে হেঁটেছিলাম। চিত্ত উতলা করে।  

ওড়না আমার ত্রস্ত হয়েছে, চুনরীতে কিছু দাগ 

পারবনা আর একলা চলতে? দ্বীপে বসিও না ভাগ। 

জন্মলগ্নে পাপগ্রহ ছিল, গোচরে মনখারাপ

পূর্ণিমার সাথে আড়ি, অমাবস্যার সাথে ভাব।    




ধর্ষিতার পরিবার 

তারা ধর্ষক, ঘটনা ঘটাতে ওস্তাদ! লোমহর্ষক, চিত্তাকর্ষক !

তারা একটা ক্লাস! নারীর শরীর যাদের কাছে নিছক কাঁচের গ্লাস!

গুঁড়িয়ে দিয়ে মাটির ওপরে, থেঁতলে দিয়ে শরীর

কত মজাই না লুটলে পুরুষ, ভোগের কিম্বা বলির।   











Friday, February 4, 2022

মেয়েনদী

 কালোই হোক কিম্বা ধলো, নদী আসলে চিরনবীন  

সরস্বতী মেয়েটা আসলে বিদ্যেধরী বর্ণহীন। 

মেয়ের ছিল বড্ড দাপট, চুপিসাড়ে মারত ঝাপট।  

সামলে নিত রূপগুণ সব ক্রোধ ছিল তার বড়ই কপট। 

অপছন্দ পুরুষ সঙ্গ, একরোখা সে বড়োই জেদি 

আসলে সে ডরায় নি তো, ছিল যে সে প্রতিবাদী। 

এই মেয়েটাই সরস্বতী, দূরে রাখে পুরুষ সমাজ। 

শাসন, শোষণ, অত্যাচারে বিয়ের কথায় কেবল নারাজ।

একহাতে সে নাচিয়েছিল, তাবড় সব মুনিঋষি। 

অভিশাপে নদীশরীর রক্তধারার এলোকেশী। 

শোনপুণ্যা হয়েই আবার ফিরেছিল বারিধারা। 

বশিষ্ঠ কী বিশ্বামিত্র তঠস্থ তাই চক্ষেহারা। 

নদীটা আজ পথহারা, রইল মনে মেয়েটা তাই 

আজও বুঝি এই মেয়েকেই আঁচলা ভরে ফুল দিয়ে যাই। 

নদীর বুকে কান্না ছিল, আঁচল ভরা দুঃখ ছিল 

সরস্বতীই রইল মনে নদীটা আজ হারিয়ে গেল।

Tuesday, October 12, 2021

কন্যাকুমারী / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

 কন্যাকুমারী, কন্যাকুমারী কোথা যাও তুমি প্যান্ডেলে?

জামা দেব, কাপড় দেব, আদরও দেব তুমি এলে। 

কন্যাকুমারী, কন্যাকুমারী তুমি কী বসেছ মণ্ডপে? 

ফলমূল দেব, ভোগ বেড়ে দেব, পূজব তোমায় দীপধূপে। 

কন্যাকুমারী বেনারসি চেলি, মাথায় মুকুট, ওড়না 

ঠোঁটের কোণায় চিলতে হাসি, চোখে লাজের বন্যা। 

কন্যাকুমারী, কন্যাকুমারী কুমারীপুজোর লগ্ন  

ধুমধাম আজ অষ্টমীতিথি এসবই তোমার জন্য। 

কন্যাকুমারী, কন্যাকুমারী তুমি অ-রজস্বলা 

কুমারীজ্ঞানে দেবীর পুজো তবুও এ ছলাকলা। 

অঋতুমতীই অপাপবিদ্ধ? দোলাচলে পড়ি আমি 

অম্বুবাচীর কামাখ্যাপুজো সব ভুলে গেছ তুমি? 

কন্যাকুমারী কন্যাকুমারী উঠুক এই নিয়ে শ্লোগান 

ঘরের দুর্গা, জ্যান্ত দুর্গা কন্যাশ্লোকের জয়গান। 


  


Sunday, April 11, 2021

হবে হবে সব হবে

 ঘটিগরম, তরজা তুফান, উস্কানি আর দাদাগিরি, 

চোখরাঙানি, বাহুবলে হচ্ছে নেতার ভোটফেরি। 

আমার হবে, তোমার হবে, চৈত্র সেলে জামা হবে

বোশেখ পড়লে বিয়ে হবে, খাওয়াদাওয়া দেদার হবে। 

ভোট হবে, চোট হবে, জোট হবে না ঝুট হবে? 

বাড়ি হবে, গাড়ী হবে, পার্টি হবে, কভিড হবে।  

শাড়ি হবে, ফুচকা হবে, রাতবিরেতে আড্ডা হবে 

আমআদমির নোলা হবে, লুচি মাংস পোলাও হবে।  

চেবানো হবে, চাটা হবে, চোষা হবে, গেলা হবে

চর্ব্য চূষ্য লেহ্য পেয়, কচু ঘেঁচু, গেলা হবে। 

জল হবে, ঘোলা হবে, কেউ কারোর চ্যালা হবে 

ছেলে হবে, মেয়ে হবে, সরল হবে জটিল হবে। 

ঠ্যালা সাম্লাতেই হবে, মাটির ডেলা হতেই হবে

ন্যালাক্ষ্যাপা মানুষ হবে, তেলা মাথায় তেল দেবে 

মুখ্যুসুখ্যু মানুষ হবে, গল্পস্বল্প গেলা হবে। 

মুরগী হবে মাটন হবে, ছাপ্পান্ন ভোগ হবে 

গেলা হবে, খাওয়া হবে, বেহুলার ভেলা হবে। 

ভোট হবে, জোট হবে, মানুষের মেলা হবে 

কভিড হবে, বন্যা হবে, মিটিংমিছিল সব হবে। 






Sunday, April 4, 2021

নাসিগোরেং

 এক যে ছিল সাধের বাগান, রঙীন সব্জী চাঁদের হাট

মিলেমিশে মরিচ-মশলা-স্যসে সবার মজার ভাত।  

বর্ণে গন্ধে মাখামাখি, এই না হলে নাসিগোরেং? 

স্বাদ নিতে তা বানিয়ে ফেলে বোস-পাল-দাস-দে-সোরেন। 

দেশীয় নাম তেরঙ্গা ভাত খেলেই তুমি কুপোকাত। 

কমলা গাজর-বিনস কুচিয়ে, তেরঙ্গা ক্যাপ্সিকাম বিছিয়ে

ডিম ফাটিয়ে ঝুরো করে মুরগী, চিংড়ি ভেজো পরে। 

ফুরফুরে ভাত জুঁইফুলে, পেঁয়াজ পড়বে গরম তেলে। 

এবার সাজাও ভাতের বাগান, সোয়া স্যসে স্বাদ মহান। 

গোলমরিচের গুঁড়োর ঝাঁঝে ভাত ভাজা হবে সবার মাঝে। 

ভাত তেরঙা উপুড় প্লেটে এক্ষুণি তা ঢুকবে পেটে।

পেঁয়াজ ভেজে লাল করে ডিম ফাটিয়ে দিও পরে 


মুরগি কুচি দাও ছড়িয়ে, সবজি সব দাও ঘুরিয়ে

দুয়েক ফোঁটা ভিনিগার, লংকাকুচির অবারিত দ্বার। 

ভাতের সাথে জমিয়ে ভাজো, নেড়েচেড়ে সবাই সাজো।

তেরঙা ভাত, মাংস ভাজা, খাবার ঘরে আজ সে রাজা।

শোনো শোনো গপ্পো শোনো নাসিগোরেং নামটি জেনো  

এ রান্নার মন্দভালো খিদের মুখে জ্বলবে আলো।

তোমাদের যা মিক্সড ফ্রায়েডরাইস, ওদের তা নাসিগোরেং 

জমিয়ে সেটাই বানিয়ে ফেলে ঘোষ-বোস-দাস-পাল-দে-সোরেন। 

Saturday, January 2, 2021

করোনাও ভয় পেল?

করোনাসুন্দরী তাঁর ছানাপোনাদের ঘুম পাড়াতে গিয়ে আজকাল রীতিমত নাকের জলে চোখের জলে। কোভিডানন্দ এদের মধ্যে সবচেয়ে দুষ্টু। মায়ের চোখ ঘুমে জুড়ে আসছে। সারাদিন সব্বোমাটি মাড়িয়ে দুনিয়ায় সংক্রমণ ছড়িয়ে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে রাতের দিকটায়।শরীর দেয়না তখন। ওদিকে ভয় আছে কখন কে সাবান জল ছিটিয়ে দিল গায়ে, কে স্যানিটাইজার সংপৃক্ত করে রাখল তার যাত্রাপথ। একেই মানুষ খুব সচেতন হয়ে পড়েছে। বিজ্ঞানীরা দিন রাত এক করে ফেলেছে । মনে মনে হাসিও পায় করোনাসুন্দরীর আবার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে। নিজে য্যাত‌ই লোককে ভয় দেখাক তার‌ও তো ভয় ধরেছে এখন। কোভিডানন্দ খেলা করেই চলেছে ওদিকে। ঘুম নেই তার চোখে, আপনি বকে চলেছে মা...কোভিড, কোভিড করে মায়, কোভিড গেছে কাদের নায়, সাতটা কাকে দাঁড় বায় কোভিড রে তুই ঘরে আয়। কোভিডানন্দ ফিক করে হেসে বলে ওঠে, এই তো ঘরেই আছি মা, তোমার কোলের কাছেই শুয়ে আছি নেপের তলায় দিব্য। কোথায় আর যাব? মা বলেন, ভয় ধরেছে বাপ আমার! কি করে তোদের যে সব বাঁচিয়ে বর্তে রেখেছি তা আমি জানি আর জানে তোদের বাপ্! কোভিডানন্দ বলে, আমাদের বাপ কোথায় মা? করোনাসুন্দরী বলে তোমাদের বাবা কি আর যে সে লোক বেটা, প্রণম্য সার্স কোভিডগোত্রীয় উচ্চবংশীয় ক্ষমতাশালী বামুন জাতীয় যার পূর্বপুরুষ স্বর্গতঃ মার্স দেবশর্মণরা বুঝেছ?  

এবার ঘুমিয়ে পড় বলছি নয়ত আমি একানড়ে কে ডাকব। আমার ফোনটা রাখ দিকিনি। এই ফোন হল যত নষ্টের গোড়া।  

কোভিডানন্দ খিলখিল করে হেসে বলে আমি ভয় পাইনা, বলেই গাইতে আরম্ভ করে আমি ভয় করব না ভয় করব না... দুবেলা মরার আগে সাবান জলে মরব না...   

বলিস নি রে অমন করে ...কার কপালে কি লেখা আছে কেউ জানেনা। 

ছেলের আমার আজ ঘুমের বেলায় ভয় না পেয়ে গানে পেয়েছে। অন্যদিন বেম্মাদত্যি, শাঁখচুন্নির ভয়ে দিব্যি ঘুম এসে যায় তার। 

মা বলে তাহলে জেগে বসে থাকো। আমি একটু গড়িয়ে নিই। 

কোভিডানন্দ মনের আনন্দে গাইতে শুরু করে... 

আমরা এমনি এসে ভেসে যাই... 

হাওয়াতে জড়িয়ে, ফুলের রেণুতে... 

নিঃশ্বাসে আর প্রশ্বাসে ভাই। 

কে আমাদের দেখাবে ভয়? 

বাতাসের সওয়ারি তে ভেসে বেড়াই, রোগ ছড়াই... 


আজ ভোর থেকেই কোভিডানন্দের শরীরটা ভালো নেই। মা' কে ঘুণাক্ষরে জানায় নি সেকথা। আসলে ভয় ঢুকেছে তার মনে। বন্ধুবান্ধব কাল সারারাত হোয়াটস্যাপে মেসেজ করছে কেবলই... জানিস কোভিড? আমাদের ডেজ আর নাম্বারড। বিষাক্ত ভ্যাকসিনে ছেয়ে গেছে বাজার! মানুষ সচেতন হয়েছে। ইমিউনিটি বুস্টার খেয়ে খেয়ে এযাবত খুব তাকত হয়েছে রে ভাই!  

Friday, December 18, 2020

"রান্নাটা ঠিক আসেনা" / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

 ভবানী প্রসাদ মজুমদারের "বাংলাটা ঠিক আসেনা"র প্যারোডি 

হেঁশেল আমার খুব হাইফাই, রান্নাবান্না হয়না 

জানেন দাদা, আমার আবার রান্নাটা ঠিক পোষায় না।   

মডিউলার কিচেন আমার খুব শখে বানানো 

কিচেন হব, সেরামিক টাইলস, চিমনি টিমনি লাগানো 

আমার আবার বাতিক খুব, কিচেন নোংরা করিনা  

জানেন দাদা, আমি আবার রান্নাবান্না পারিনা। 


মিক্সি টিক্সি, মাইক্রোওভেন, ওটিজি সবই মজুত 

কর্তামশায়ের বাজারের নেশা, বড়োই তরিজুত। 

কী লাভ বলুন রান্না করে? 

সবই মেলে বাড়ির দোরে 

সেইকারণেই আমি আবার তেমন কিছু বানাই না 

জানেন দাদা, আসলে আমার রান্নাটা ঠিক আসে না।


রান্না আবার কাজ নাকি, নেই কোনও ‘চার্ম’ রান্নায় 

হালুইকরে পারে যা, আমায় কি তা মানায়? 

চাইনিজ অথেনটিক 

কন্টিনেন্টল হেলদি 

বাংলা খাবারে আছেটা কি? গ্ল্যামার নেই জানেন না? 

জানেন দাদা, আমার আবার রান্নাটা ঠিক আসে না।


বাংলা রান্না যেমন তেমন, ঝোল ভাত খুব প্যানপ্যানে

ডাল-পোস্ত আলুসেদ্ধ একঘেয়ে আর ঘ্যানঘ্যানে।

এসব নিয়ে মাতামাতি, 

রান্নাঘরে হাতাহাতি 

কি যেন সব রাঁধত মায়ে? শীতের পৌষমাসে না?

জানেন দাদা, আমার আবার রান্নাটা ঠিক আসে না।


চাইনিজ সোজাসাপটা, সোজা আরও থাই 

স্যসের কেরামতি ডিমসাম্‌ স্যুই মাই। 

দইমাছ, মোচা থোড়, বোগাস আর বোরিং।

বড্ড রিচ মালাইকারি, আমি আবার ফড়িং। 

তবুও খেতাম যদি পেতাম, রাঁধতে ইচ্ছে করেনা  

জানেন দাদা, আমার আবার রান্নাটা ঠিক আসেনা। 


বাঙালী তো নালেঝোলে, চচ্চড়ি আর অম্বলে 

পোস্ত-শুক্তোয় নাড়িকাটা, ছ্যাঁচড়া-ভাপার স্বাদ পেলে 

রান্নার লোকের বড়ই অভাব

স্যুইগি জ্যোম্যাটো খাওয়াই স্বভাব

ওদের হাতে রান্না খেলে জুতসই ঠিক হয়না 

জানেন দাদা, আমার আবার রান্নাবান্না পোষায় না। 


বিদেশী রান্না না পারি, হেঁশেল আমার জব্বর 

বাঙালীর রান্না পারা কি আর এমন খবর? 

স্যান্ডুইচ, পিতজা, বার্গার এসব নিয়েই বাঁচি 

ভাত রুটি সব বাদ দিয়ে দিব্য বেঁচে আছি। 

এসব রান্না নিয়ে এখন কেউ সুখের স্বর্গে ভাসে না

জানেন দাদা, আমার আবার বাংলা রান্না আসেনা।


বাংলা রান্না তেল ঝাল আর হলুদ নুনে ঠাসা 

তার চেয়ে তন্দুরি আর কাবাবেই ভালোবাসা। 

মডিউলার কিচেন আমার, তেল কালি মোটে পড়েই না

জানেন দাদা, আমার আবার রান্নাবান্না জমেই না । 

Monday, September 28, 2020

এই সেই জন্ম-উপত্যকা

 সেই মৃত্যু উপত্যকা দেখে এলাম কবি। কি ভয়ংকর সে রূপ! 

কি দুর্গম তার তুষারলীলা। অহোরাত্র ভেজা ভেজা সৃষ্টিরহস্যের উপত্যকা। 

শীতলতায় এত শীত্কার হয় কবি? 

সে যেন সত্যি রংয়ে-তুলিতে আঁকা ছবি। 

পুরুষ আর প্রকৃতি দুয়ে মিলে এ কি সম্ভোগ দৃশ্য! 

পাহাড়ের গাম্ভীর্যে এত পৌরুষ? চোরা গ্লেসিয়ার হার মেনে যায় তার কাছে। 

আকাশের নীল, তুঁতের মত উজ্জ্বল হয়ে ওঠে সেই সম্ভোগ লীলা দেখতে দেখতে। 

তুষারের এই ঝর্ণাধারায় পাহাড় যেন কলকলিয়ে ওঠে। 

সেই মৃত্যু উপত্যকায় কবি, তুমি শুনেছিলে মরণ সঙ্গীত। 

আর আমার মত তুচ্ছ একজন শুনতে পেল জীবনের গান, বাঁচার গান। 

নদীর বহমানতা, পাহাড়ের শীতলতা আর আমার চোখ সাক্ষী রয়ে গেল 

পাহাড়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হল আমার সাথে মেঘের। 

মেঘের মিনার স্থানান্তরিত হল মৌসুমীর দেশে। 

বৃষ্টি ফোঁটারা উধাও তখন দিনকয়েকের জন্য। 

এ সেই মৃত্যু উপত্যকা কবি! 

আমি পা রাখলাম মরুপ্রান্তরে। 

যক্ষের রামগিরি পর্বত খুঁজে পেলাম যেন। 

বিরহিনীর কাছে মেঘ-মেল পৌঁছেচে তখুনি। 

আমার নীলচে আকাশের নীচে হলুদ বালুকাবেলা। 

কত আঁকাবাঁকা শৈল্পিক সাজগোজ সে বালির! 

উট চলেছে সেখানে মুখটি তুলে 

আর আমি পড়ে র‌ইলাম ঝুলে। 

সোনাগলা রোদ্দুর যেখানে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে আইসিকলের ওপরে, 

স্ট্যালাগটাইটের মত বরফ ঝুলতেই থাকে বরফের গায়ে..

এই কি সেই মোহমায়া? যার অমোঘ টানে আমি হ‌ই ঘরছাড়া? 

তুমি তো বলেছিলে কবি, এ মৃত্যু-উপত্যকা আমার দেশ নয় 

আমি কিন্তু বারেবারে বলে এলাম, 

এই আমার দেশ, এই আমার জন্ম-উপত্যকা! 

পাহাড়ের প্রতিটি ভাঁজ আমার চেনা এখন। তেরঙ্গা পর্বতের চাদরের প্রতিটি ভাঁজ আমার চেনা।  

তুষারসাদা স্রোতকে আমি বিলক্ষণ চিনি এখন। 

ঠিক যেমন চিনি আমার মা, বাবাকে...

আমি‌ই তো সে, যে সৃষ্টিপাথরের রহস্য উন্মোচন করে 

চিনতে শিখল সেই জন্ম-উপত্যকা!

Monday, September 14, 2020

লেটস পার্টি টু'নাইট

  

গোদাবরী তীরে, ক্যাডবেরী মুখে, নাচে হ্যালবেরী মম্‌  

কোলাভেরী গানে, জিন-শেরী হাতে, নাচে মেরী-কেরী টম্‌ 

দোস্ত তেরী-মেরী, জ্বালাইল বিরী, ধরি শ্যামা-গোরী হাত। 

কত সহচরী, খায় ভেলপুরী, চটী কোলাপুরী কুপোকাত ।   

প্রেমে জলপরী, পরে সাতনরী,  গায় দরবারী কানাড়া

শাড়ী বালুচরী, পরে নসীপুরী,  খায় ভেজ-পকোড়া।

নটী শর্বরী, নাচে কুচিপুরী, রাসভারি বরাবরি 

আড়চোখে চায়, রসভরী খায়, অপছন্দ দাদাগিরি ।

রায় নরহরি, খালি ভাঙে সিঁড়ি, জড়াজড়ি করে দোতলায়

পাল বলহরি, গেয়ে আশাবরী, পায় কানাকড়ি ও'পাড়ায় ।

কেউ ধরাধরি, কেউ জোরাজুরি, খোঁটে ফুসকুড়ি অনীহায়

চাষী রাখোহরি, ছেড়ে থোড়বড়ি, রাঁধে চচ্চড়ি সেপাড়ায় ।

কেউ শাদীকরি, করে ছাড়াছাড়ি, বাড়াবাড়ি বেশীবেশী।

আমি পায়েপড়ি, বলি ধ্যুত্‌‌তেরী, আহামরি দিবানিশি।

Friday, June 5, 2020

করোনার রান্নাঘর


করোনাকালের শুরুতেই ছিল ফ্যানাভাত আলুপোস্ত
আর ছিল ফ্যানস্যুপ, ম্যাগি, চাউ, ছিলনা কেবলি গোস্ত।
ডালের সঙ্গে রোজরোজ আছে খসখসে খোসা স্টারফ্রাই
আলুভাতের ইনোভেশনে মনে বড় যেন বড় জোর পাই।
পিঁয়াজ আর শশা লঙ্কা কুচিয়ে স্যালাড আর দই রায়তা
একটু আধটু জিভের টাকনা মন্দ লাগেনা ভাতটা।
পরে এলো ঘরে শাক সুক্তুনি ঝাল ঝোল আর অম্বল
পটল বেগুণে দই ঘেঁটে দিই যদি থাকে টক দম্বল।
খিচুড়ি বেগুনি চালেডালে মিশে করোনার দিন থইথই
রাতেরবেলায় দিব্য চলেছে খই কলা আর টক দই।
সুফলবাংলা রাঙা আলু দিল বানালাম পান্তুয়া
সুজি দুধ গুলে বানাতেই পারো চটপট মালপুয়া।
বাঙালির নুচি, অগতির গতি উপোসের রাতে যদি চাও
ছাতুর পরোটা গুড ফর হেলথ, ময়ানটা যদি কম দাও।
সুজির হালুয়া, ফ্রুট কাস্টারড, পুডিং আর ছিল পায়েস
এত জানি তাই বাইরে কিনিনি খেয়ে করে গেছি আয়েস।
ময়দা ভিজিয়ে, চালগুঁড়ো দিয়ে জিলিপিও ভেজে খাসা
সাধ ছিল যেন মুচমুচে হয় রসে ফেলবার আশা।
দুদিন দুধ কেটে গেল দেখে কাটিয়ে ফেলেছি ছানা
জাঁক দিয়ে তাকে কালাকান্দ করে তাক লাগিয়েছি যা না!
তাই দেখে তিনি রোজই বলেন দুধ যেন কেটে যায়
মিষ্টি বিহনে রাতের খানা খেতে মন নাই চায়।
বেসন আর সুজি টক দই ইনো ফ্রুটসল্টের ধোকলা
কারিপাতা আর সরষে ফোড়নে খেয়ে নেবে সব ফোকলা।
গোলারুটি ছিল ভারি মজাদার ছড়িয়ে পেঁয়াজ কুচি
খাটুনি হয়েছে যেদিন ভেজেছি বেগুন আর কটা লুচি।
শেষপাতে ভাই শাশুড়ির চাই টকমিষ্টি চাটনি
চাটনি বানানো সবচেয়ে সোজা একটুও নেই খাটনি।
কুড়োনো আমের পাল্পে ঢেলেছি চিনি আর শুধু চিনি
শিশি ভরে জ্যাম বানিয়ে ফেলেছি আর যেন নাই কিনি।
ঝড়ে পড়া মোচা পেয়েছি ফোকটে, চিংড়ি দিয়েছে বাদাবন
মোচাচিংড়ির এমন সোয়াদ পায়নি বাড়ির লোকজন।
কেউ শুনছি লকডাউনেই বানিয়েছে বিরিয়ানি।
শুনেই কেন যে কান্না এসেছে এখনও বুঝতে পারিনি।
সাবেকী রান্নাঘরেতে রয়েছে বাটি চচ্চড়ি ডানলা
স্বাদে ও গন্ধে আমোদিত তারা ফোড়নেই মাত জানলা।   

Wednesday, June 3, 2020

অভিশপ্ত বুধবার


একডজন লকডাউনের বুধবার পেরুবো আজ। গত দুটো বুধবারের সেই অভিশপ্ত ঝড়ের রাতের দগদগে ঘা এখনো শুকোয় নি আমার। আজ আবারো বুধবার এসে পড়লেই বুক চিন্‌ চিন্‌ করছে। আড়ষ্ট হয়ে আছি। তার মধ্যে মৌসুমী বায়ুর কেরালায় প্রবেশ। মনসুন এসে গেলেই অন্যবার মনে হয় একটা ফিলগুড ফ্যাক্টর কাজ করছে আমাদের সবার। ভালো চাষবাস হবে, দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। জিডিপি বাড়বে সেই আশায়। এবার সে গুড়ে বালি। একে একে বিয়ের মরশুম বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, আষাঢ়, শ্রাবণ পেরিয়ে আবারো ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক মাসে কোনো শুভকাজ হবেনা বাঙালীর। এই বিয়ের মরশুমে প্রচুর বিক্রিবাট্টা হত। গয়না থেকে শাড়ি, উপহার থেকে খাবারদাবার, মুদিখানা মায় দশকর্ম, প্রসাধনী দ্রব্য থেকে তত্ত্ব সাজানোর ট্রে, ফুল থেকে মালা এমন কি ডেকরেটার থেকে কেটারার... সব ছোটো, বড়, মাঝারি ব্যাবসায়ীদের অর্থনৈতিক মাস এই মরশুম। আবারো অপেক্ষা অঘ্রাণের জন্য। এবছর পুজো, দেওয়ালি তেমন জমবে না। কিছুই কেনাকাটি হয়ত হবেনা। পৌষ আবার মলোমাস।  মাঘ-ফাগুনের পর আবারো চৈত্র মাসে কোনো শুভ কাজ নেই। এসব ভাবছিলাম আমার ভাঙা কাচের আদিগন্ত বিস্তৃত সেই দেওয়ালের দিকে চেয়ে।  হঠাত দেখি উল্টোদিকের একটি বাড়িতে বাঁশ বাঁধা হচ্ছে বেশ সমারোহে। আহা! হোক, হোক। বেশ কিছু লোকজন কাজ করছে। বিয়ে হবে হয়ত ঘটা করে। সব‌ই হয়ত পূর্ব নির্ধারিত। রান্নার ঠাকুর, ডেকরেটার, ফুল, মালা, মাছ, মাংস, শাড়ি গয়না সব কিনবে এই বাড়ির লোকজন। আহা! কিনুক, খরচা করুক। কেন‌ই বা তারা বিয়ে দেবেনা? কিন্তু বর্ষা যেন আর না আসে দাপিয়ে। ঝড় যেন আর না আসে অভিসারে। কিন্তু আজ যে আবার বুধবার। সে কি শুনবে?
গতকালই তো বর্ষার প্রিওয়েডিং ফোটোশ্যুট ছিল। ঘন মেঘনীল শিফনশাড়ি, জলের ফোঁটার মত স্পার্কলিং মুক্তোর গয়নায় কাল দারুণ সেজেছিল মেয়েটা। সবচেয়ে সুন্দর ছিল চোখের মেকআপ। ঘনকালো চোখের পাতা ছুঁয়ে আকাশী রং লাইনার।বিয়ের আগের দিন সব মেয়েদের চোখ থাকে এমনই নরম। তারপর সব কেমন বদলে যাবে টুক করে। নরমে গরমে সেই চাউনিই হবে কাল। ভাবী বর মেঘও কাল ছিল অন্যপুরুষ। পরণে ছিল নেভিব্ল্যু রেশমি  শেরওয়ানি।সে ও বুঝি কঠিন হবে আগের থেকে। এই যেমন হঠাত এল করোনা, তার পেছন পেছন আমাপান। আবার আসছে নিসর্গ। কিন্তু আমার মোটেও ভালো লাগেনি বর্ষা আর মেঘের এবারের এই বিয়ের ভাবনা।

আমাদের জীবন কেমন বদলে বেরঙীন হয়ে গেল! সবটুকুনি কবে বর্ষার প্রিওয়েডিং ফোটোশ্যুটের মত আবারো রঙীন হয়ে উঠবে? 

Tuesday, May 19, 2020

মঙ্গলচণ্ডীর করোনা পুরাণ

আজ আমার দুই মা আর আমি জৈষ্ঠ্যমাসের প্রথম মঙ্গলবারে প্রতিবারের মতোই জয় মঙ্গলবারের পুজো তুলে রেখে ছড়া পড়ে জল খেলাম। আমার মায়ের কলাপাতার খিলিতে যব, মাসকলাই দিয়ে গদ গেলা আছে আমার শ্বশুরবাড়ি তে নেই । আমার মায়ের ব্রতকথা পড়া আছে আমার মর্ডান শ্বশুরবাড়িতে নেই। তবে ব্রতকথার শুরুতে ছড়াটা দুই বাড়িতেই এক।

আটকাঠি, আটমুঠি, সোনার মঙ্গলচন্ডী রূপোর বালা কেন মাগো মঙ্গলচন্ডী হল এত বেলা?
হাসতে খেলতে, তেল হলুদ মাখতে, আঘাটায় ঘাট করতে, পাটের শাড়ি পরতে, আইবুড়োর বিয়ে দিতে,
হাপুতির পুত দিতে, অশরণের শরণ দিতে, অন্ধের চক্ষু দিতে, বোবার বোল ফোটাতে, 
ঘরের ঝি-বৌ রাখতে ঢাকতে তাই এত বেলা।
আমি আজ ছড়াটা পড়েই ভাবলাম, এর একটা বিহিত করে মঙ্গলচন্ডীর কাছে আর্জি জানানোর প্রয়োজন। 
তাই বললাম,
আটকাঠি, আটমুঠি, সোনার মঙ্গলচন্ডী রূপোর বালা কেন মাগো মঙ্গলচন্ডী হল এত বেলা?
হাসতে খেলতে, সাবান মেখে চান করতে, গ্লাভস, মাস্ক বিলি করতে, স্যানিটাইজ করতে করতে, ঘরের ঝি-বৌদের হাইজিন শেখাতে শেখাতে, করোনা সংক্রমণ রুখতে হল এত বেলা।
আবারো বলি,
আটকাঠি, আটমুঠি, সোনার মঙ্গলচন্ডী রূপোর বালা, তুমি কি মা অন্ধ নাকি বোবা কালা?
উনি বললেন,
কি আর করি? পরিযায়ী শ্রমিক বাঁচাতে, ক্ষুধাতুরে অন্ন দিতে, রেশনে ত্রাণ বিলি করতে, আসন্ন পোয়াতির সুখপ্রসব করাতে, খাদ্যবন্টনে দুর্নীতি রুখতে, আর্থিক প্যাকেজের অর্থ বোঝাতে, বোঝাতে কেটে গেল বেলা।
আমি আবারো বলে উঠলাম,
আটকাঠি, আটমুঠি, সোনার মঙ্গলচন্ডী রূপোর বালা, মানুষের জীবন নিয়ে আর করবে কত খেলা? 
উনি বললেন,
কথা বলিস না, দেব মার, থুতু থেকেই যতকিছু শিখিয়ে পারিনা আর! 
গোষ্ঠী সংক্রমণ রুখতে, বুড়োদের ঘরে বন্দী করতে, ফল সবজি সাবান জলে ধুতে ধুতে, বাইরের জুতো বাইরে রাখতে, রাস্তার মোড়ে আড্ডা রুখতে রুখতে, বাজার বন্ধ করতে করতে আসছি, আমার যে বড় জ্বালা।
আর তুই কিনা কোস্‌ এত বেলা?
আমি এবার ছোট্ট করে ক‌ইলাম,
আটকাঠি আটমুঠি সোনার মঙ্গলচন্ডী, কোথায় টেষ্ট কিট? কোথায় ভ্যাকসিন?
মা মঙ্গলচন্ডী বললেন, হচ্চে তো সবকিছু,
এন্টিবডি টেষ্ট, ক্লোরোকুইন, রেমডেসিভির কিম্বা ফ্যাবিটিডিন
অতিমারি এর নাম সবুর কর্‌ আর কটা দিন!  

Sunday, May 10, 2020

খোলাচিঠি রবিঠাকুরকে....


তুমি না কি স্কুল পালিয়ে ছবির খাতায় আঁকো  ?
গোল্লাছুটের দুপুরগুলোয় কাব্যি করে লেখো?
রবিঠাকুর তোমার নাকি  খুনসুটির এই ভোর
গান লিখতে  সিঁড়ি ভেঙে চিলেকোঠার দোর ।
রবিঠাকুর তুমি চেনো মেঘের কোলে রোদ ?
জীবনভর তোমার দেনা কেমনে করি শোধ ? 
ছোট্টবেলায় মা চেনালো রবিকবির আলো
সেইতো আমার হাতেখড়ি গান-বিকেলের ভালো ।
রবিঠাকুর তোমায় যদি সেলফোনেতে পেতাম
এসেমেসের বৃষ্টি ফোঁটা উজাড় করে দিতাম । 

রবিঠাকুর জানো তুমি মাল্টিপ্লেক্সের ঢল্‌ ?
তোমার গল্প-গানছবিতে মাতাল শপিংমল ।
রবিঠাকুর দেখবে তুমি ফ্লাইওভারের ধারে
হোর্ডিং ওলা রঙিন ছবি শিল্পী সারেসারে ।
দেড়শো তোমার পূর্ণ হ'ল পুজোয় মাতে লোক
প্রভাতফেরী গানের ভেরী দেড়শো মানার ঝোঁক । 

রবিকবি তুমি না কি ফেসবুকেতে আছো?
স্টেটাসে তে কাব্যি ঝরাও মনের সুখে বাঁচো ।
রবীন্দ্রনাথ আছো তুমি যন্ত্রজালে বন্দী
ট্যুইট দেখি মাঝেসাঝে বুঝি নাকি ফন্দী ?
রবিঠাকুর রবিঠাকুর খোলা খেরোখাতা
ছিটেফোঁটা দাওনা লিখে মনের দুটো কথা ।

Sunday, December 15, 2019

পথ

পথ দিয়ে চলতে চলতে এখনও খুঁজে চলেছি আমি সেই পথ, যে কোন দাবী করবে না আমার কাছে। 
সেই সঙ্গে হাতড়ে চলেছি সেই পথের শেষটুকুও। 
আমার চলার পথের দুধারে যেমন আছে সবুজ দুধেল ধানের খেত তেমনি আছে ঘন জঙ্গুলে পথ। 
সেই পথের বাঁকে আছে এক চিলতে নদীর তিরতির করে বয়ে চলা। 
এই পথ আমার খুব চেনা লাগে তবুও একেক সময় মনে হয় তাকে বড় অচেনা। 
মাঝেমাঝেই সেই পথে হাঁটতে হাঁটতে কাঁকরে পা পড়ে যায় আমার। 
সেই পথ আমাকে আঘাত দেয়, তবুও সেই পথে চলতে আমাকে হবেই। 
পথের কিছু দাবী আছে, আমার কাছে, আমারও আছে সামান্য। 
আমার চলার জন্য‌ই সেই দাবীগুলো মাঝেমধ্যেই পথ আমাকে মনে করায়। 
আমিও পথের দাবী মেটাতেই সেই পথ দিয়েই চলি তবুও ভুল পথে যাই মাঝেমধ্যে।  

Monday, December 9, 2019

একটি পিঁয়াজের জন্য / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

ও বৌদি, একটা বড় পিঁয়াজ কাটি? এতেই হবে বলো না?
বৌদি বলেন, দাঁড়াও বাপু, এ পেঁয়াজী আর মানায়না । 

একটু ঝিরিঝিরি কেটে রাখ মুসূরডালের  ফোড়নে
আরেকটু কুচো রেখে দিও ডিম টা ভাজার জন্যে।
বাবু খাবে শশার রায়তা, দুচামচ তার জন্য
আমার স্যালাডে দুটো চাকা রাখলে অমি ধন্য। 
ডুমো করে কেটে রাখ মুর্গির স্ট্যু হবে 
বেগুণ পোড়ার জন্যে রেখো, রাতের বেলায় খাবে। 
টমির আবার বদ অভ্যেস, পিঁয়াজ ছাড়া রোচেইনা 
স্যুপের জন্য মাখনে ফোড়ন? না দিলেই হয়না?
ছেলেটার স্যান্ডুইচে পাতলা দুটি স্লাইস রেখো 
মেয়েটার স্কুল ফেরত ঝালমুড়িটাও কিন্তু মেখো । 
শাশুড়ির চাই আজ‌ দুপুরেই চিংড়ি বাটিচচ্চড়ি   
শ্বশুরের চাই আজকেই ভাই ঢেঁড়স পোস্ত হড়হড়ি। 
একটা মোটে পিঁয়াজ পড়ে এই দিয়ে যে কি করি?  
বিকেলে গেস্ট আসবে, চাউমিনেই তবে সারি? 
পেঁয়াজ ছাড়া কি চাউমিন হয়? ভাবতে কাবার বেলা   
কবে যে ভাই শেষ হবে এই পিঁয়াজির খেলা?  

ও বৌদি? একটা মোটে বড় পিঁয়াজ, এতেই হবে বল?
না হয় তো মাথা খেও আগেই ভেবে চল। 

Wednesday, August 14, 2019

Naree

তুমি কি কারো বক্ষলগ্না? কিম্বা ঘুম ভেঙে ওঠা টাটকা কান্না?
অথবা যদি মনে পড়ে স্মৃতি? সেও ছিল, হয়নি কি ক্ষতি?
একলা চলতে শেখোনি কেন যে! বারেবারে তোমায় বলেছিলাম যে 
একলা চলো, একলা চলো,
হয়ত আগে, কিম্বা পরে,  দোলপলাশের বৃষ্টি ঝরে
পথের দুপাশ তাকিয়ে নিও, বন্ধু থাকলে সঙ্গে নিও।
একলা চলো একলা চলো, পুরুষটিকে আগেই বলো।  
তুমিও পারো যে একলা চলতে, ভালোয় মন্দে ঝড়ে বৃষ্টিতে 
নারী হয়ে ছিলে তার পাশে, আজো তোমার মনটা যে হাসে   
ওড়না তোমার ত্রস্ত হয়েছে, চুনরীতে কিছু দাগ যে লেগেছে 
পারবেনা নারী একলা চলতে ? মা না হয়ে শুধু জিতে যেতে 
সেখানেই ওরা গেরামভারী  দেখিয়ে দাও না বাঁচতে যে পারি।
যুগে যুগে ওরা ধর্ষক হয়,   লিঙ্গ ওদের মহান সহায় ।  
বাজে কথা ছাড়ো কাজে এসো নারী,বলো ধর্ষককে যেন সাজা দিতে পারি। 

Wednesday, March 7, 2018

সাজ

 
ও মেয়ে তুই কার জন্যে আলতা পরিস? কার জন্যে হাত রাঙাস?
কিসের জন্যে মেহেন্দীতে খয়ের ভেঙ্গে লালচে বানাস?
কেন রে তোর মাথার সিঁথি টকটকে লাল শালু কাপড়?
ধবধবে তোর শাঁখার কোলে লাল পলাটা আজো অনড়!
বাঁহাতের তোর নোয়া টা যেন কালশিটে সেই আগের!
বেঁধে রাখার অভ্যেসটা সয়েই গেল আজো তোদের।
কপালের টিপ টুকটকে লাল, ফেটেছে মাথাটা সজোরে
ধাক্কা লেগে সত্যি সেদিন বউ হয়েছিস তেমনি করে।
কার ব‌উ তুই? কেন রে ব‌উ? কিসের জন্যে বুক বাঁধিস?
শ্যামলা গাঁয়ের আদুড় গায়ে আগুণ তাতে কি রাঁধিস?
শ্যামলা মেয়ের আলতাপাটি যুগে যুগে থাকল রাঙা
আসলে তো কপালটা তোর এক্কেবারেই ছিল ভাঙা।
আখ পেষায়ের যাঁতাকলে অহোরাত্র চাপে আছিস
ত্যাগের মন্ত্র জীবন করে মুখ বুঁজে তুই হাসি চাপিস।
বারোমেসে তেরো পাব্বন কার জন্য কেন করিস?
লক্ষ্মী পাতা, উপোস ব্রত বসুধারা যত্নে আঁকিস।
যার জন্য এত মঙ্গল, আঁকড়ে রাখিস মানুষটিকে
সে কি তার মূল্য বুঝে আগলে রাখে শুধুই তোকে?